সময়ের মূল্য(The Value Of Time) | বাংলা রচনা | প্রবন্ধ রচনা | মাধ্যমিক রচনা | মাধ্যমিক প্রবন্ধ রচনা | সময়ানুবর্তিতা | সময়ের সদ্ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা | ছাত্রজীবনে সময়ের সদ্ব্যবহার | ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে সময়নিষ্ঠার তাৎপর্য | সময়ের অপব্যবহারের পরিণাম | সময়কে কাজে লাগানোর উপায় | সময়নিষ্ঠ ব্যক্তির উদাহরণ |
সময়ের মূল্য
ভূমিকা:সময়মানব জীবনেরঅমূল্য সম্পদ। পৃথিবীতে কর্মঅনন্ত, কিন্তুমানবজীবন সংকীর্ণ। মহাকালের অন্তহীনসময়ের একটিঅতি ক্ষুদ্রঅংশ এইমানবজীবন। কিন্তুজীবনের পরিসরেরতুলনায় মানুষেরজন্য নির্ধারিতকর্ম অনেকবেশি। ক্ষুদ্রজীবনের স্বল্পপরিসরে মানুষকেঅনেক গুরুদায়িত্বপালন করতেহয়। ক্ষুদ্রএই জীবনেরএক মুহূর্তসময় হেলা-ফেলায়নষ্ট করলেঅনেকখানি পিছিয়েপড়তে হয়। তাই মানবজীবনকে সার্থকও সুন্দরকরতে হলে, জীবনের প্রতিটিমুহূর্তকে মূল্যবানমনে করতেহবে এবংযথাযথ কাজেসময় ব্যয়করতে হবে।
সময়েরমূল্য:সময়অমূল্য সম্পদ। পার্থিব জীবনেরধন-সম্পদহাতছাড়া হয়েগেলে কঠোরপরিশ্রমের মাধ্যমেহারানো সম্পদপুনরায় অর্জনকরা যায়, স্বাস্থ্য নষ্টহলে চিকিৎসারমাধ্যমে তাফিরে পাওয়াযায়। কিন্তুযে সময়একবার চলেযায়, কোনোকিছুর বিনিময়েতা আরফিরে আসেনা। ইংরেজীতেএকটি প্রবাদআছে-‘Time and tide wait for none’। নদীরবয়ে যাওয়াস্রোতকে যেমনচাইলেও আরফিরিয়ে আনাসম্ভব নয়, ঠিক তেমনিঅতিবাহিত সময়কেওফেরত আনাযায় না। মানুষ শতচেষ্টা করলেওঅতীতের দিনগুলিফিরিয়ে আনতেপারে না। আর একারণেইজাগতিক কোনোমূল্যমান দ্বারাসময়কে বিচারকরা যায়না। রবার্টব্রাউনিং যথার্থইবলেছেন- ‘একটাদিন চলেযাওয়া মানেজীবন থেকেএকটা দিনঝরে যাওয়া।’ আর ঝরেযাওয়া দিনটিকেকোনো কিছুইবিনিময়েই পুনরুজ্জীবিতকরা সম্ভবনয়। ফলেএক মুহূর্তসময় অপচয়করা মানেজীবনের একটাঅংশের অপচয়করা। আরএই অপচয়েরপরিণাম ভয়াবহ।
সময়ানুবর্তিতা:সময়েরকাজ সময়েকরাই হলোসময়ানুবর্তিতা। সময়ানুবর্তিতামানব চরিত্রেরঅন্যতম মহৎগুণ যামানুষকে সফলতারদ্বারে পৌঁছেদেয়। জগতেপ্রতিটি কাজেরজন্য উপযুক্তসময় নির্ধারণকরা থাকে। এ প্রসঙ্গেপবিত্র বাইবেলেঘোষিত হয়েছে, ‘এই পৃথিবীতেপ্রত্যেক কাজেরএকটা উদ্দেশ্য, একটাকাল ওএকটা সময়আছে।’ নির্ধারিতসময়ের মধ্যেকাজটি সম্পন্নকরাই সময়েরসদ্ব্যবহারকারী ব্যক্তিরলক্ষণ। আরযে ব্যক্তিসময়ানুবর্তি, তারজীবনে সাফল্যঅবশ্যম্ভাবী। স্বল্পপরিসরে আবদ্ধমানবজীবনকে কালোত্তীর্ণকরে তোলারপ্রধান শর্তহলো সময়েরসদ্ব্যবহার করা। বিনা কারণেসময় অপচয়করলে পরবর্তীজীবনে তারমাশুল দিতেহয়। তাইফকির লালনশাহ গেয়েগেছেন, ‘সময়গেলে সাধনহবে না।’ তাই জীবনেপ্রতিষ্ঠালাভের প্রধানশর্ত সময়ানুবর্তিতাজীবনের স্বল্পসময়কে কাজেলাগিয়ে কোনোমহৎ কাজসম্পাদন করারমধ্যেই ব্যক্তিজীবনের সার্থকতাফুটে ওঠে। মানবজীবনকে স্বার্থককরতে প্রত্যেকেরমূলমন্ত্র হওয়াউচিত-‘Work while you work, play while you play, And that is the way to be happy and gay.’
সময়েরসদ্ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা:জীবনেরপ্রতিটি মুহূর্তমূল্যবান। যারাএই মূল্যবানসময়কে কাজেলাগাতে পারেতারাই স্মরণীয়বরণীয় ব্যক্তিহিসেবে পৃথিবীরইতিহাসে স্থানকরে নিতেসক্ষম। প্রকৃতপক্ষেজীবনের প্রতিটিমুহূর্তকে কাজেলাগিয়ে নশ্বরপৃথিবীতে অবিনশ্বরকীর্তি স্থাপনকরার মধ্যেইমানব জীবনেরসার্থকতা নিহিত। সময়কে যথাযথভাবেকাজে লাগাতেনা পারলেজীবনে ধ্বংসঅনিবার্য। এমনবহু দৃষ্টান্তআছে যে, সময়ের অপব্যবহারকরার কারণেঅনেক প্রতিভাসম্পন্নলোকও ধ্বংসেরঅতল গহ্বরেহারিয়ে গেছে। পার্থিব জীবনেরসব থেকেবড় সম্পদএই সময়। আর তাইবলা হয়েথাকে- 'Time is money’ সময়েরসদ্ব্যবহারের মাধ্যমেজীবনে সাফল্যআসে, আবারএই সময়েরঅপব্যবহারের কারণেজীবন হয়েওঠে দুর্বিষহ।
ছাত্রজীবনেসময়ের সদ্ব্যবহার:ছাত্রজীবনহলো মানবজীবনগঠনের সর্বোৎকৃষ্টসময়। তাইছাত্রজীবনে সময়েরসদ্ব্যবহারের অনুশীলনসর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রজীবনের প্রতিটিমুহূর্তই অত্যন্তমূল্যবান। কেননাছাত্রজীবনে যারাসময়কে সঠিকভাবেকাজে লাগাতেপারে তারাইপরবর্তীতে কর্মজীবনেপরিপূর্ণ সফলতালাভ করতেপারে। সময়েরঅপব্যবহারকারী অলসছাত্ররা কেবলপরীক্ষাতেই অকৃতকার্যহয় নাবরং জীবনেরপ্রতি পদক্ষেপেতাদেরকে ব্যর্থতারগ্লানি বহনকরতে হয়। ছাত্রজীবনে যারাকঠোর সময়ানুবর্তিতারঅনুশীলন করেতাদের জীবনেসাফল্য অবধারিত। তাই ছাত্রজীবনইহলো সময়ানুবর্তিতাঅনুশীলনের উপযুক্তসময়। বিখ্যাতব্যক্তিদের জীবনালেখ্যপর্যালোচনা করলেদেখা যায়যে, তারাপ্রত্যেকেই ছাত্রজীবনথেকেই কঠোরসময়ানুবর্তিতার অনুশীলনকরে গেছেন। আর এরইফলস্বরূপ তাঁরাআজ অনুস্মরণীয়ব্যক্তিত্বে পরিণতহয়েছেন।
ব্যক্তিও জাতীয়জীবনে সময়নিষ্ঠারতাৎপর্য:সময়ানুবর্তিতাকেবলমাত্র ব্যক্তিজীবনেই সাফল্যবয়ে আনেনা, একইসঙ্গে জাতীয়জীবনেও সমৃদ্ধিনিয়ে আসে। ব্যক্তি জীবনেপ্রতিষ্ঠা প্রাপ্তিরমূলশর্ত সময়েরসদ্ব্যবহার করা। আর যেজাতির প্রত্যেকনাগরিক সময়ানুবর্তী, সে জাতিরসাফল্য অবধারিত। বিশ্বের সকলকবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, বিজ্ঞানী, দার্শনিক-এরাপ্রত্যেকেই নিজনিজ কর্মেসময়ানুবর্তী ছিলেন। যার ফলেতারা ব্যক্তিজীবনেসাফল্য তোপেয়েছেনই, সেইসাথে জাতিরওমুখ উজ্জ্বলকরেছেন। তাঁদেরহাত ধরেজাতিও সমৃদ্ধিঅর্জন করেছে। কেবলমাত্র সময়ানুবর্তিতারবলেই দ্বিতীয়বিশ্বযুদ্ধে পুরোপুরিবিধ্বস্ত দেশজাপান বর্তমানেবিশ্বের অন্যতমএকটি উন্নতজাতি হিসেবেপ্রতিষ্ঠা লাভকরতে সক্ষমহয়েছে।
সময়েরঅপব্যবহারের পরিণাম:সময়েরঅপব্যবহারকারী ব্যক্তিরজীবনে ধ্বংসঅনিবার্য। সময়েরঅপব্যবহার করেকখনোই জীবনেরলক্ষ্য অর্জনকরা সম্ভবহয় না। সময়ের অপচয়েকেবল ব্যক্তিএকা নয়বরং গোটাসমাজ ওজাতি ক্ষতিগ্রস্তহয় এবংসময়ের অপব্যবহারকারীব্যক্তি অচিরেইআস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্তহয়। কথায়বলে- ‘সময়েরএক ফোঁড়, অসময়ের দশফোঁড়।’ অর্থাৎযে কাজটিনির্ধারিত সময়েকরলে একবারেইসুষ্ঠুভাবে করাযেত, সেটিইসময় পেরিয়েযাওয়ার পরেকরতে গেলেদশবারেও সম্পন্নকরা যায়না। আরএর ফলেসময়ের অপব্যবহারকারীব্যক্তি কেবলপশ্চাতেই পড়েথাকে। এইপশ্চাপদতা তাকেনিয়ে যায়ধ্বংসের দিকে। ওয়াটার-লু’রযুদ্ধে নেপোলিয়ানেরকোনো একসেনাপতি নির্ধারিতসময়ের কয়েকমিনিট পরেহাজির হয়েছিলেনবলে ঐযুদ্ধে নেপোলিয়ানকেশোচনীয়ভাবে পরাজয়বরণ করতেহয়েছিল। সময়েরমূল্য যারাবোঝে নাতাদের জন্যহতাশা ব্যর্থতারগ্লানি অবশ্যম্ভাবী।
সময়কেকাজে লাগানোরউপায়:একদিনেরচেষ্টায় কোনোমানুষ সময়ানুবর্তিতারগুণটি আয়ত্তকরতে পারেনা। তাইসব থেকেভালো উপায়হচ্ছে পরিবারেরমাধ্যমে প্রতিটিশিশুর মধ্যেএ অভ্যাসটিগড়ে তোলা। জীবনের শুরুথেকেই শিশুকেসময়ানুবর্তিতার শিক্ষাদিলে পরবর্তীতেসহজেই সেসময়কে কাজেলাগাতে পারবে। শিশুকে বোঝাতেহবে পড়ারসময় পড়াএবং খেলারসময় খেলা। সময়ের কাজসময়ে নাকরার ক্ষতিকরদিকগুলো সম্পর্কেওশিশুকে অবহিতকরতে হবে। পারিবারিক এসবশিক্ষা শিশুকেপরবর্তী জীবনেসময়ানুবর্তী হতেসাহায্য করবে। এছাড়াও প্রত্যেকমানুষেরই উচিতপ্রতিদিনের সময়কেনির্ধারিত কাজগুলিদ্বারা ভাগকরে নিয়েপ্রতিটি কাজইযথাযথ সময়েসম্পন্ন করারঅভ্যাস করা। সময়কে সঠিকভাবেকাজে লাগানোরসবচেয়ে সহজউপায় হলোপ্রাত্যহিক রুটিনতৈরি করেনেওয়া। সকালথেকে রাতপর্যন্ত প্রতিটাকাজের রুটিনকরে নিলেসময়ের সঠিকব্যবহার করতেপারা যায়।
সময়নিষ্ঠব্যক্তির উদাহরণ:মুহূর্তকেইতাঁরা যথাযথভাবেপৃথিবীর ইতিহাসেস্বর্ণাক্ষরে যাদেরনাম লেখারয়েছে, তাঁরাপ্রত্যেকেই সময়েরমূল্য সম্পর্কেসচেতন ছিলেন। জীবনের প্রতিটিকাজে লাগিয়েছেন। আর এইকঠোর সময়ানুবর্তিতারমাধ্যমেই স্বল্পজীবনকে তাঁরাকরে গেছেনমৃত্যুঞ্জয়ী। বিশ্বেরপ্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী-দার্শনিকতাঁদের জীবনেরপ্রতিটি মুহূর্তকেকাজে লাগিয়েক্ষুদ্র জীবনেইকত শতমহৎ সৃষ্টিরেখে গেছেন। বিশ্বনবী হযরতমুহাম্মদ (স.), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুলইসলাম, সক্রেটিস, আইনস্টাইন, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, নিউটন, শেক্সপিয়ার প্রমুখকীর্তিমান ব্যক্তিদেরজীবন পর্যালোচনাকরলে দেখাযায়, তাঁরাকেউই সময়সম্পর্কে উদাসীনছিলেন নাবরং সময়েরসদ্ব্যবহারের মাধ্যমেইতাঁরা আজওজগদ্বিখ্যাত হয়েআছেন।
উপসংহার:সময়েরমূল্য সম্পর্কেসচেতন নাহলে জীবনেরকাক্সিক্ষত লক্ষ্যঅর্জন করাসম্ভব হয়না। যারাসময়কে মূল্যবানমনে করেএবং প্রতিটিমুহূর্তকে যথাযথভাবেকাজে লাগানোরচেষ্টা করেতারাই সুখী-সমৃদ্ধজীবন লাভকরে। জীবনেরপ্রতিটি ক্ষণকেউপযুক্ত কাজেব্যয় করতেপারলে ক্ষণস্থায়ীজীবনেও মহৎসৃষ্টির স্বাক্ষররেখে যাওয়াসম্ভব। আরএভাবেই মানুষমরনশীল হওয়াসত্ত্বেও অমরত্বলাভ করে। তাই আমাদেরপ্রত্যেকেরই উচিতসময়ের মূল্যসম্পর্কে সচেতনথেকে সময়নিষ্ঠহবার মধ্যদিয়ে জীবনকেস্বার্থক ওসমৃদ্ধ করেগড়ে তোলারচেষ্টা করা।
Comments
Post a Comment
Ask me anything here...