Elementary Education In India
Inidan Eductaion System-I
A brief overview of the ancient Indian Education System
the concept of "Guru" of the yore and the professional teacher of today.
Significant recommendations of the commissions and committees during the British Period upto 1947 with reference to elementary education.
1) Discuss about the components of ancient Indian Education.
2) Broadly discuss about the educational system in the Vedic Period.
3) Discuss about the rules maintained by the disciples in guru's house in Vedic Period.
4) Broadly discuss the contribution of Education System in the Brahmanic Period.
5) How far the ideal of Brahmanic education system is acceptable in modern education system? Write down the defects in Brahmanic education system.
6) Describe various personal characteristics/qualities of teachers.
7) Describe various Professional characteristics/qualities of teachers.
8) Discuss the role of teachers in teaching process.
9)Describe the duties of a teacher with respect to modern education system.
10)Describe the difference in the role of teacher in ancient education system and modern education system.
১) প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষার উপাদানগুলি আলােচনা করাে।
২) বৈদিক যুগের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলােচনা করুন।
৩) বৈদিক যুগে গুরুগৃহে শিষের পানীয় বিধিগুলি সম্পর্কে আলােচনা করুন।
৪) ব্রাক্ষ্মণ শিক্ষা ব্যবস্থার অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত আলােচনা করুন।
৫) বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ব্রাহ্মণ্য শিক্ষার আদর্শ কতখানি গ্রহণযােগ্য ? ব্রাক্ষ্মণ শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটিগুলি লিখুন।
৬) শিক্ষকের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যগুলি বা গুণাবলি বর্ণনা করুন।
৭) শিক্ষকের পেশাগত বৈশিষ্ট্যাবলি বা গুণাবলী বর্ণনা করুন।
৮) শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের ভূমিকা আলােচনা করুন।
9) বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষকের দায়বন্ধতাগুলিকে বর্ণনা করুন।
১0) প্রাচীন ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের ভূমিকা সংক্রান্ত পার্থক্য বর্ণনা করুন।
1)প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষার উপাদানগুলি আলােচনা করাে।
(Discuss about the components of ancient Indian Education.)
Ans. বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যায় যে, ভারতীয় সভ্যতার ধারাবাহিকস খুব সাবলীলভাবে ঘটেনি। তার চলার পথে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বাধা এসেছে। কিন্তু ভারতীয় সভ্যতা এতটাই উন্নত যে, কোনাে বাধাই তার চলার পথকে রুদ্ধ করতে পারেেনি। বর বিনিন বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমেই ভারতীয় সভ্যতা অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছে যে অভিজ্ঞতাগুলি ভারতীয় শিক্ষাকে পুষ্ট করেছে। এইজন্য আধুনিককালে আমরা শিক্ষার রে রূপ পাই সেটি প্রাচীন ভারত থেকে পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে প্রচীন ভারতীয় শিক্ষার চরিত্রকে পর্যবেক্ষণ করলে আমাদের দুটি বিষয়কে স্বীকার করতে হয় 1. ভারতবর্ষে প্রথম পদার্পণকারীদের মৌলিক প্রকৃতি এবং 2. সক্রিয় বিকাশের জন্য দেশ তথা পরিবেশের প্রকৃতি যেখানে মৌলিক সংলক্ষণগুলি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। প্রাচীন ভারতীয় জনসংখ্যা আর্য এবং অনার্যদের মিশ্রণ। যার ফলে আর্যদের আধ্যাত্মিক প্রকৃতি অনার্যদের প্রাক্ষোভিক এবং চারুকলার প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়, আর এর মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি (Ancient Indian Culture)। প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষার উপাদানগুলিকে চার ভাগে ভাগ করে নিতে পারি। সেইগুলি হল-
1. জাতিগত উপাদান (Racial Factor): ভারতবর্যে যেসব মানুষ বসবাস করত তারা কোনাে একটি জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতির বা জাতিগােষ্ঠীর আগমন হয় এবং এরা সমাজে কমবেশি চিহ্ন রেখে যায়। ইতিহাস এবং নৃতত্ত্বের পর্যালােচনা করলে জানা যায়, প্রধানত তিন ধরনের জাতি প্রাচীন ভারতে এসেছিল এবং দীর্ঘকাল বসবাস করেছিল। তারা হল আর্য, দ্রাবিড় গােষ্ঠী এবং মঙ্গোলিয়ান। পরবর্তীকালে এই তিন ধরনের মানুষ আলাদা-আলাদাভাবে থাকতে পারেনি, তদুপরি তাদের মধ্যে এমনভাবে সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছিল যে এই গােষ্ঠীদের মাথাতেই হিন্দু ধারণার প্রথম বীজ বপন হয়ে গেল। বৈদিক যুগে যাদের ঋষি বা মুনি বলা হত তারা শুধুমাত্র সংস্কৃত ভাষায় মন্ত্র রচনা এবং আত্মত্যাগের অনুশীলনের পারদর্শী দিলেন তাই-ই নয়, তারাও যুদ্ধ করতে, ফসল ফলাতে জানতেন। যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য তারা সুপ্রশিক্ষিত ছিলেন। অপরদিকে দ্রাবিড় জাতি সংগীত এবং সূক্ষ্ম কলায় পারদর্শী ছিলেন। এইভাবে আর্য এবং অনার্যদের গুণাবলি সব মিলেমিশে হিন্দু সভ্যতার জন্ম দেয়। বলা যায়, প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষায় আধ্যাত্মিক, নৈতিক, ধর্মীয় আদর্শগুলি যেমন আর্যদের কাছ থেকে উৎপত্তি লাভ করে, তেমনই ভারতীয় শিক্ষার বৃত্তিমূলক এবং নান্দনিক দিকগুলো দ্রাবিড় জাতির অনুপ্রাণিত করেছিল।
2. ভৌগােলিক উপাদান (Geographical Factor): ভৌগােলিক উপাদান বলতে বুঝব বিশেষ করে ভারতের প্রাকৃতিক অবস্থানকে। জাতিগত উপাদান থেকেই আমরা অবগত ই যে, আর্যরা সামরিক দক্ষতায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিল এবং বহুদিন পর্যন্ত তাদের নিজস্ব জায়গা ধরে রাখার জন্য শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ জারি রেখেছিল। কিন্তু অনার্যদের প্রতিহত করার ক্ষমতা যখন ভেঙে পড়ল তখন তাদের বলিষ্ঠতা প্রকাশের তেমন আর কোনাে জায়গা রইল না। ফলে স্বাভাবিকভাবে ভারতীয়দের জন্য বেঁচে থাকার সংগ্রাম আরও সহজ হয়ে গেল এবং জীবনযাপন করার জন্য হতাশাও গেল কমে। প্রাকৃতিক প্রাচুর্যতা প্রাচীন ঋষিদের আধ্যাত্মিক চিন্তনে যে সহায়কের ভূমিকা পালন করেছেন—তাতে কোনাে সন্দেহ নেই।
3, সামাজিক উপাদান (Social Factor): সেই বৈদিক যুগেই বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। সমগ্র সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এই চারটি জাতিতে বিভক্ত ছিল। প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল জাতিপ্রথা। যদিও ঋগবৈদিক যুগে জাতিপ্রথা তেমনভাবে বিকাশ লাভ করেনি; প্রতিটি মানুষ ছিলেন পুরােহিত, একজন সৈন্য, একজন চাষি এবং আরও কিছু। সময়ের সঙ্গে কিছু পরিবার বিশেষ বিশেষ জ্ঞানের দ্বারা নিজেদের ভিত্তি সুদৃঢ় করে তােলে। কেউ কেউ আধ্যাত্মিক আত্মত্যাগ এবং মন্ত্র রচনায় বিশেষজ্ঞ হলেন, আবার কেউ কেউ সামরিক দক্ষতায় পটু হয়ে উঠলেন। এইভাবে সমাজের জটিলতার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমের ক্ষেত্রে বিভাজন পরিলক্ষিত হতে থাকে। প্রাচীন হিন্দুরা সমাজকে একটি সম্পূর্ণ সংগঠনরূপে বিবেচনা করতেন এবং প্রারম্ভে প্রতিটি সদস্য তাদের নিজস্ব গুণ ও ক্ষমতা অনুযায়ী কার্যে অংশগ্রহণ করতেন এবং সেটাই পরবর্তীকালে বংশপরম্পরায় তা অনুসরণ করে চলত। আর এইভাবে পরবর্তী সময়ে কার্য পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন জাতির সৃষ্টি হয় এবং খুব স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন জাতির জন্য শিক্ষার প্রয়ােজনীয়তা পৃথক হয়ে ওঠে। সমাজের মধ্যেকার এই কর্তৃত্ব বা প্রভাব শিক্ষার পাঠক্রম পদ্ধতি এবং সমগ্র ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয়। সেইসব প্রতিফলন বিবর্তিত হয়েই আজকের শিক্ষা ব্যবস্থার বিন্যাস।
4. ধর্মীয় উপাদান (Religious Factor): ধর্মীয় উপাদানকে আধ্যাত্মিক উপাদান বূপ ব্যাখ্যা করা যায়। ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক মুখ্য বৈশিষ্ট্য হল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবের তুলনায় ধর্মীয় উপাদানের দ্বারা অনেক বেশি পরিমাণে পরিবর্তিত ও পরিবর্তিত হয়েছে। ধর্ম বাস্তবিকভাবে তাদের জাতীয় জীবনের সর্বস্তরকে প্রভাবিত করেছিল। অবশ্যই শিক্ষা এর বাইরে থাকতে পারে না, পারে নি। সংস্কৃতে ধর্ম শব্দটি এসেছে ধ্ শখ থেকে, যার অর্থ ধারণ করা। ভারতীয় ধারণা অনুযায়ী ধর্ম কোনাে অন্ধবিশ্বাস নয়, ধর্ম বলতে প্রশ্ন হিন্দুদের বুঝতেন এমন এক নির্দেশিত নীতি যা মানুষের ব্যক্তিগত এবং সমাজজীবনের সর্বস্তরকে পরিচালিত করে থাকে। ধর্ম হল আদর্শ, অনুশীলন, নৈতিকতা, কর্তব্যবােধ, সহিষ্ণুতা ইত্যাদি গুণাবলির এক সমন্বিত রূপ। এই ধর্মীয় উপাদান শধমাত্র শিক্ষার লক্ষ্যের ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণ করে, তা নয় ব্যাবহারিক অনুশীলন এবং অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করে। ইংরেজি Religion শব্দটিও এসেছে Re-Ligare থেকে, যেখানে Re অর্থাৎ পুনরায় এবং Ligare অর্থাৎ একস্গে আবদ্ধ করা। এই ধারণাগত অর্থ থেকে বলা যায়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক জীবনের মৌলিক নীতিগুলি একই সূত্রে গ্রথিত হয়ে এক সমন্বিত তত্ত্বের। ভারতে প্রাথমিক শিক্ষায় সামাজিক ও কৃষ্টিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম দিয়েছে যার অর্থ হল ধর্ম বা Religion । এর ফলে ব্যাবহারিক দিকের মনােভাব তাত্ত্বি দিকের ক্ষেত্রে অনুসৃত হয়েছে। সেই কারণে ধর্ম একমাত্র প্রাচীন হিন্দুদের সামাজিক জীবন এবং সংগঠনের কর্তৃত্ব করত। এমনকি তাঁদের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করত। প্রারম্ভে ভারতবর্ষের হিন্দুরা তাদের ধর্মীয় আদর্শের প্রভাবে সাংস্কৃতিক বা আধ্যাত্মিক অধিকরণ প্রকাশ ভৌগােলিক এবং বস্তুগত অধিকরণ তুলনায় বেশি করতেন। তাই ব্যাপক অর্থে বলা যায়, তারা তাদের দেশকে আধ্যাত্মিকতাবাদ বা সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে নির্ধারণ করতেন। ভারতবর্ষের প্রথম দেশ যে দেশ বহির্ভূত জাতীয়তার ধারণাকে জাগ্রত করতে পেরেছিল।
প্রাচীনকালে হিন্দুদের ধর্মীয় চিন্তাধারা তিনটি বিভিন্ন সূত্রের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছিল-
1.বাল্যস্তর (প্রথম স্তর),
2. পূর্ণবয়স স্তর (দ্বিতীয় স্তর) এবং
3. বার্ধক্য স্তর (তৃতীয় স্তর)।
আর্যদের ধর্মীয় কার্যাবলির প্রথম স্তর প্রত্যক্ষজ স্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং তাদের প্রত্যক্ষ আগ্রহের সঙ্গে যুক্ত। দ্বিতীয় স্তরে ঋষিদের মন প্রাকৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তব দৃষ্টিকোণে পরিবর্তিত হয়। এই স্তরের মুখ্য বৈশিষ্ট্য হল ত্যাগের উপর গুরুত্বদান। তৃতীয় স্তরে বিশ্বের উৎস এবং সেই পরম ক্ষমতার প্রকৃতির উপর গভীর চিন্তাধারায় আচ্ছন্ন হতে দেখা যায় চিন্তাধারা এবং আদর্শের এই প্রবণতা যা তুতীয় স্তরে দেখা যায় তার প্রতিফলন উপনিষদের শিক্ষণে লক্ষ করা যায়। এর থেকে ধারণা করা হয় যে, প্রাচীন ভারতে শিক্ষার ধারণা সেই সময়ের মানুষের জীবন দর্শন থেকে বিকাশ লাভ করেছিল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি ছিল জাতির আদর্শের প্রতিবিম্ব স্বরূপ, যার মধ্যে দিয়ে সভ্যতার প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়। প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষা বলতে মূলত বৈদিক শিক্ষা ও বৌদ্ধ শিক্ষাধারাকে বুঝিয়ে থাকে। আবার বৈদিক যুগ, পরবর্তী বৈদিক যুগ, ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থা বৈদিক শিক্ষার অন্তর্গত।
2. বৈদিক যুগের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলােচনা করুন।
(Broadly discuss about the educational system in the Vedic Period.)
Ans.
তপােবনবাসী দিব্যদ্রষ্টা, ঋষিদের ধ্যানকালে মন্ত্রসমূহ উদ্ভাসিত হয়ে উঠত। এক একজন ঋষি বা তাঁর বংশধরদের রচনা এক একটি মণ্ডলে সংগৃহীত হয়েছে। সেই দিব্যদ্রষ্টা ঋষিগণ সহজ সরল জীবনযাপন করতেন, আহার করতেন ফলমূল ও পরিধান করতেন গাছের বল্কল। তারা মন্ত্রগুলি উপলদ্ধি করে সুরসংযােগে আবৃত্তি করতেন|
শিক্ষাপদ্ধতি ও পাঠক্রম ঋবেদের যুগে পাঠক্রম ছিল শুধুমাত্র বেদাধ্যয়ন। বেদ’-এর সঠিক আবৃত্তি ও অর্থবােধ ছিল একমাত্র শিক্ষা। নির্ভুল যতি, মাত্রা ও ছন্দের সাহায্যে বেদের অধ্যয়ন শেখানাে হত। শিক্ষার্থীদের বেদের আবৃত্তিকে মঙুকের বা ব্যাঙের ডাকের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ঋগবেদের সপ্তম মণ্ডলের 103 সূক্তের 5নং শ্লোকে বলা হয়েছে।
যদেষামন্য অন্যস্য বাচং শাক্তস্যেব বদতি শিক্ষমানঃ
সর্বং তদেষাং সমৃধেব পর্ব যৎসুবাচো বদথনাধ্যম্পু।।
শিষ্য গুরুর ন্যায় যখন এ মণ্ডুক সকলের মধ্যে একটি অন্যের বাক্য অনুসরণ করে তখন (মকগণ! তােমরা সুন্দর শব্দ বিশিষ্ট হয়ে জলের উপর লম্ফ প্রদান করে, শব্দ কর...) এটির একটি সুন্দর অনুবাদকর্ম হল ঃ
“One repeats the word of another
like students echoing the voice of the teacher;
together they form a chorus
when at rain fall loudly they croak."
আবত্তিতে সঠিক উচ্চারণের ওপর জোর দেওয়া হত। শুধু উচ্চারণ নয় ঋক্ বা মনে অত্যকটি শব্দের উপলব্ধি করার ওপরেও জোর দেওয়া হত। বেদের অর্থ সম্যকভাবে উপলব্ধি না করে শুধুমাত্র আবৃত্তি বা মুখথকে চন্দনকাষ্ঠবাহী গাধার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে “Slightest lapse in uttering a letter of a word of the vedic Mantra on the part of a teacher will spell utter ruin and disaster to him." |
আদি সংস্কৃত ভাষায় লেখা অথর্ববেদে এসে আমরা ওই সময়কার শিক্ষার একটি আদর্শ চিত্র পাই।
প্রাচীন ভারতে শিক্ষাব্যবস্থায় ব্রম্মচর্যের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হত। প্রথমে উপনয়ন সংস্কারের মধ্য দিয়ে শিষ্যকে গুরুগৃহে প্রবেশ করতে হত। উপনয়নের মধ্য দিয়ে ছাত্র বা শিষ্য দ্বিজত্ব লাভ করত। শতপথ ব্রায়ণের একাদশ কাণ্ডের পঞম অধ্যায়ের চতুর্থ ব্ৰায়ণের প্রথম সূত্রে উল্লেখ আছে যে, আমি ব্রম্মচর্যের জন্য এসেছি, আমাকে ব্রম্মচারী হতে দেওয়া হােক (I have come for brahmacharya... Let me a Brahmacharin (student)। এরপর গুরু তার নাম ধাম ও পরিচয় প্রভৃতি জিজ্ঞেস করে সন্তুষ্ট হলে তবেই তাকে ছাত্ররূপে গ্রহণ করতেন। ছাত্ররূপে গ্রহণের পর আচার্য ও ছাত্রের মধ্যে একটি আধ্যাত্মিক বন্ধন তৈরি হত। আচার্যদেব শিষ্যকে সম্বােধন করে বলতেন, “তােমার হৃদয় আমার হৃদয়ে মিশে যাক, তােমার মন আমার মন এক হােক, আমার বাণীতে তুমি হৃদয়ে আনন্দ লাভ কর, তুমি আমার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীরূপে যুক্ত হও, আমার ভাবনা-চিন্তায় তুমি সমৃদ্ধ হও, তুমি আমার প্রতি শ্রদ্ধানত থাক ও আমি যখন উপদেশ দেব তুমি নিঃশব্দে তা গ্রহণ কর।” এভাবে দীক্ষাদানের পর আচার্য ব্রম্মচারীকে বলতেন, “আজ থেকে তুমি ব্রম্মচারী হলে ও ব্রম্মচর্যের নিয়ম পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলে। এই অমৃত পান করাে। আপন কর্তব্য পালন করাে। প্রতিদিন যজ্ঞকুণ্ডে সমিধ দান করাে। অগ্নির পবিত্র জ্যোতিতে নিজেকে উদ্ভাসিত করাে। আচার্যের আজ্ঞাধীন হও। দিবানিদ্রা ত্যাগ কর। জিতেন্দ্রিয় হও।”
অথর্ববেদের একাদশ কাণ্ড তৃতীয় অনুবাক্যের প্রথম সূক্তের 3 নং ঋক্-এ বলা হয়েছে—
“আচার্য উপনয়মানাে ব্রম্মচারিণং কৃনুতে গর্ভমন্তঃ।।
তং রাত্রীস্তিস্ত্র উদরে বিভর্তি তং জাতং দধুমভি সংযন্তি দেবাঃ”
আচার্য ব্রম্মচারীকে আপন বিদ্যাময় শরীরের মধ্যে গর্ভসঞ্চার করে তিনরাত্রি নিজ উদরে ধারণ করেন। চতুর্থ দিবসে বিদ্যাময় শরীর থেকে উৎপন্ন ব্রম্মচারীকে দেখার জন্য দেবতারা তার অভিমুখে আসেন। –“By laying his right hand on (the pupil) teacher becomes pregnant (with him). In the third night he is born as a savitri... therefore he should reach the Brahmana at once. ” এই অনুষ্ঠানকে মেধাজনন (Medhajanana) বা সাবিত্রীব্রত অনুষ্ঠানও বলা হয়। A.S Altekar বলেছেন, “The preceptor performed the Medhajanana ritual for sharpening the memory, intellect and grasping power of the student.”
ছাত্রগণ তাদের শিক্ষাজীবন সমাপ্তির পূর্বে বেশ কয়েক বৎসর (সাধারণত বারাে বৎসর) গুরুগৃহেই বাস করত।
এই সময়ে ছাত্রদের কতকগুলি চিহ্নধারণ করতে হত—যথা অজিন বা হরিণাদিপশুর হল, স্কা বা গাছের ছাল, দণ্ড বা যষ্টি, মেখলা ঘাসের কোমরবন্ধনী, উপবীত সূত্র এবং হটা! হে সময় তার ভিক্ষা সংগ্রহ প্রভৃতি কতকগুলি বাইরের কর্তব্যও ছিল, পড়াশােনা, ধ্যান ও তপশ্চর্যা এবং বিশ্রাম প্রভৃতি অভ্যন্তরীণ করণীয় কৃত্য ত ছিলই। এছাড়া যজ্ঞের জন্য সচিব (কাষ্ঠ) সংগ্রহ, গােচারণ, হােমকুণ্ডের অগ্নি সংরক্ষণ ও ভিক্ষান্ন সহ পানীয় জলও সংগ্রহ করতে হত।
3. বৈদিক যুগে গুরুগৃহে শিষের পানীয় বিধিগুলি সম্পর্কে আলােচনা করুন।
(Discuss about the rules maintained by the disciples in guru's house in Vedic Period.)
Ans, বৈদিক যুগে গুরুগৃহে শিষের পানীয় বিধিগুলি হল-
1 .ব্রহ্মচারীকে অসংস্কৃতি ভূমিতে শয়ন করতে হত। 2. গুৱৱ শয্যা গ্রহণের পর শিষ্যকে শয্যা গ্রহণ করতে হত।
3 গুরুর শয্যা ত্যাগের পূর্বে শিষ্যকে শয্যাত্যাগ করে অপেক্ষা করতে হত।
4 প্রণাম কালে দক্ষিণ হস্ত দিয়ে গুরুর দক্ষিণ চরণ ও বামহস্ত দিয়ে বামচরণ স্পর্শ করতে হত।
5 আগে নাম গােত্র বলে গুরুকে অভিবাদন করতে হত।
6 বসে, শুয়ে শুয়ে, বা খেতে খেতে বা অন্যদিকে চেয়ে গুরুর সঙ্গে বাক্যালাপ নিষি ছিল।
7. গুরু গমনশীল হলে শিষ্যকেও তার পিছন পিছন গিয়ে কথা বলতে হত।
৪ গুরুর দৃষ্টি পথের মধ্যে যেখানে সেখানে বসা যেত না।
9. গুরুকে শ্রী, ঠাকুর প্রভৃতি উপাধিযুক্ত করে অভিবাদন জানাতে হত। গুরু সাক্ষাতে ন থাকলেও তার নাম ধরা চলত না। কেবল নাম না বলে গুরুমশায়, আচার্যমহাশয় উপাধ্যায় মহাশয়, ইত্যাদি ভাষায় পরিচয় দিতে হত।
10.গুরুর চলাফেরার, কথা বার্তা, বা কোনাে কিছুরই ব্যঙ্গ বা নকল করা নিষিদ্ধ ছিল।
11. গুরুর নিন্দা করা যেমন অনুচিত তেমনি নিন্দা বা কলঙ্ক শােনাও অনুচিত।
12 গুরুর সঙ্গে একাসনে বসা যাবে না, তবে এক শিলার ফলকে, নৌকায় বা রথেযে একত্র গমন নিষিদ্ধ নয়।
13. গুরুর গুরু উপস্থিত থাকলে তাকেও সমভাবে সম্মান দেখাতে হত।
14. বেদ পাঠের প্রারম্ভে ও অন্তে গুরুর পাদবন্দনা করতে হত।
15. শিষ্যের পক্ষে ছাতা, জুতা, চন্দন অনুলেপন, সুগন্ধদ্রব্য ব্যবহার ও মালা প্রভৃতি ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল।
16. নৃত্য, গীত ও স্ত্রীলােকের সঙ্গে আলাপ নিষিদ্ধ ছিল।
17. গুরু নিকটে এলে বসে না থেকে দাঁড়াতে হত।
18. হাতি ও ঘােড়াতে আরােহণ নিষিদ্ধ ছিল।
19. আশ্রমের জন্য জল, কুশ, পুষ্প, সমিধ সংগ্রহ নিত্যকর্ম ছিল।
20. প্রতিদিনই গুরুর দেহ মার্জনা করে চন্দন দিয়ে অনুলিপ্ত করতে হত।
21. গুরুর পাদুকা, শয্যা, বসার আসন, এমন কী গুরুর ছায়াও পা দিয়ে স্পর্শ করা নিষিদ্ধ ছিল।
22. ব্রহ্মচারীকে মুণ্ডিত মস্তক হতে হত বা জটা রাখতে হত।
23. গুরুর অনুমতি না নিয়ে বিশেষ কোনাে স্থানে যাওয়া যেত না।
24. গুরুকে পা দেখানাে, গুরুর সামনে হাই তােলা, হাঁচি দেওয়া, হাসিঠাট্টা করা একেবারেই নিষিদ্ধ ছিল।
25. ব্রহ্মচারী সব সময় বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক শুচিতা বজায় রাখতে হত।
26. সবসময় শ্রুতি সুখের ও হিতকারী বাক্য প্রয়ােগ করতে হত।
27. গুরুর সামনে কান ঢেকে বসা, অবসথিকরণ (বেড় দিয়ে বসা), অবয়ব বিশেষ আশ্রয় (গালে হাত দিয়ে বসা), পাদ প্রসারণ (পা মেলে বসা), নিষ্ঠীবন বা থুথু ফেলা,বিজৃম্ভণ (হাই তোলা), অঙ্গস্ফোটন (আড়ামােড়া) প্রভৃতি করা যেত না।
4. ব্রাক্ষ্মণ শিক্ষা ব্যবস্থার অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত আলােচনা করুন।
(Broadly discuss the contribution of Education System in the Brahmanic Period.)
Ans,
ব্রাহ্মণী শিক্ষা ব্যবস্থার অবদানগুলি হল-
1. সর্বাঙ্গীণ ব্যক্তিসত্তার বিকাশ: শিক্ষার্থীর আধ্যাত্মিক উন্নতির উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হলেও তার ব্যক্তিসত্তার সার্বিক বিকাশের উপর নজর দেওয়া হত। কেননা তখন মনে করা হত যথার্থভাবে ব্যক্তিসত্তার বিকাশ না ঘটলে আধ্যাত্মিক স্রে উন্নীত হওয়া সম্ভব নয়। এই ব্যক্তিসত্তার বিকাশ যাতে কোনােমতেই না বিঘ্নিত হয় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হত।
2. ব্যক্তিমুখী শিক্ষার প্রবর্তন :প্রতিটি শিক্ষার্থীকে গুৱ তার ব্যক্তিগত রুচি, চাহিদা, সামর্থ্য,মানসিক ক্ষমতা প্রভৃতির উপর নির্ভর করে শিক্ষাদান করতেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকেই বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করতে পারত। গুর প্রত্যেকটি ছাত্রের শিক্ষার অগ্রগতি অবহিত হতে পারতেন। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় ডাল্টন প্ল্যান, মরিশন প্ল্যান, উইনেটকা প্ল্যান প্রভৃতি ব্যক্তিগত শিক্ষাপদ্ধতির উপর গুরুত্ব দিয়েই গড়ে উঠেছে।
3. ভবিষ্যৎ জীবন গঠনের সহায়ক : শিক্ষার পাঠক্রম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল,যাতে আধ্যাত্মিক শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাবহারিক শিক্ষা লাভ করা যায়। তাই বলা 200 it aimed at providing practical knowledge for the future responsibilities of life).
4. শিক্ষার সার্বজনীনতা : সেকালে শিক্ষা গ্রহণ ও শিক্ষাদান পবিত্র কর্তব্য বলে বিবেচনা করা হত। ব্রায়ণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই ত্রিজাতির শিক্ষালাভের অধিকার ছিল। শিক্ষার একটা উন্মুক্ত হাওয়া সেকালে ছড়িয়ে পড়েছিল।
5. ব্রহ্মচর্য ও কঠোর আত্মসংযমের শিক্ষা: শিক্ষার্থীর দীর্ঘ ছাত্র জীবনে কঠোর ব্রহ্চর্য ও আত্মসংযমের শিক্ষা গ্রহণ করতে হত। ব্রয়চর্য রক্ষার ফলে মানসিক ও প্রশান্তি লাভ হত। এই মানসিক স্থৈর্য, সংযম শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে যথেষ্ট সহায়ক হত।
6. উপযুক্ত সময়ে শিক্ষা: প্রাচীন আচার্য কেন ঠিক কোন সময়ে শিক্ষাদান সংগীত। সান্তাহান্তে আট বছয় ব্রাহ্মণদের উপনয়ন দীক্ষার পরই গুৰুপহে যেতে হত। পীরে ধীরে তারা সমগ্র পাঠটিই অধিশত করতে পারত। বলা হয়েছে The Studentship period was Co-eval and Coterminous with educational period)| পাঠ্যবস্তু বিস্মরণ মেনে নেওয়া হত না ও এটিকে পাপ বলে গণ্য করা হত।
7. দৈহিক শান্তি দানের বিরোধিতা: প্রাচীন স্বৃতিকারণণ শিক্ষার্থীদের দৈহিক শাস্তি বিরােধিতা করেছেন। আপস্তম্ব, মনু, গৌতম প্রমুখ স্মৃতিকারণণ দৈহিক শান্তিদানের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের মানসিক শক্তির উপর জোর দিয়েছেন। আপস্তম্ব বিধান দিয়েছেন, A teacher should try to improve refractory students by banishing them from his presence o by imposing fast.' মনু স্মৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, অতি কঠোরতারে তাড়না ব্যতিরেকেই শিষ্যকে শিক্ষা দিবে, ... তিনি শিয্যর প্রতি মধুর ও নত্রবাক্য প্রয়াে করিবে, (বাক্ চৈব মধুরা ক্ষা..2 / 159) গৌতম সংহিতায় দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলা হয়ে শিষ্যা শিষ্টিরব্ধেন্যাশন্ত্োে রজ্জুবেণু বিদলাভ্যাং তনুভ্যামন্যেন ঘ্নন রাজ্ঞাপ্তা শাস্যঃ" অর্থ শিষ্যকে বধযােগ্য আঘাত না করে শাসন করবে, তাতে অশস্ত হলে অতিমৃদু, দলহীন কংশদ বা রজ্জ ছারা আঘাত করবে। অন্য বস্তু দ্বারা শিষ্যকে আঘাত করলে রাজা তাকে দণ্ড দেবেন।
8. আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থা : প্রাচীনকালে শিক্ষাগ্রহণের সম্পূর্ণ কালটিই গুরুগৃহে কাটাতে হত। আবাসিক শিক্ষা ব্যবস্থার যে এক বিশেষ তাৎপর্য আছে তা সব শিক্ষাবিদ স্বীকার করেছেন। গুরুগুহে থাকতে থাকতে তাদের ব্যক্তিসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটত। এই শিক্ষাব্যবস্থায় দেহ মনের সার্বিক বিকাশ ছাড়াও শিক্ষার্থীদের মনে প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হত, স্বতঃপ্রণােদিতভাবে পঠন পাঠনে আগ্রহী হয়ে উঠত।
9. গুরুশিষ্যের সম্পর্ক : প্রাচীন শিক্ষা ব্যবস্থায় গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক অতি নিবিড় ও প্রতিপূর্ণ ছিল। অধ্যাপনাকে গুরুরা অর্থকরী বৃত্তিবূপে মেনে নিতে পারত না। একদিকে ছাত্রদের গুরুর প্রতি তাঁর যেমন শ্রদধা, ভক্তি, ভালােবাসা থাকত তেমনি তাঁরাও শিষ্যদের আপন সন্তানের মতাে দেখতেন। এর ফলে উভয়ের সম্পর্ক অতি নিবিড় হয়ে উঠত।
10, চরিত্র গঠন ও সুঅভ্যাস গঠনের শিক্ষা: গুরুগৃহে শিক্ষার্থীদের শুধু পঠনপাঠনের দিত্রে জোর দেওয়া হত না, চরিত্র গঠনের ওপর জোর দেওয়া হত। জীবন সম্পর্কে একটি আদশব্য সঞ্চারিত করা হত ও শিক্ষার সঙ্গে চরিত্র গঠন ও সুঅভ্যাস অনুশীলনের চেষ্টা করা হত। এর ফলে ভবিষ্যতে তারা উপযুক্ত নাগরিক ৰূপে প্রতিষ্ঠিত হত।
11. প্রাকৃতিক পরিবেশে শিক্ষাদান :শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির মাধুর্যময় পরিবেশে পঠনপাঠনের ব্যবস্থা ছিল। দেহে মনে প্রকৃতির অন্তরঙ্গ সাহচর্যে ছাত্ররা পরম পরিতৃপ্তি সঙ্গে শিক্ষা লাভ করত। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে শিক্ষা পরিকল্পনা নিয়েছিলেন।
12. বংশগতির ভিত্তিতে শিক্ষাদান: শিক্ষা ক্ষেত্রে যে বংশগতি (Heredity) এর এক বিশেষ ভূমিকা রয়েছে-এ ব্যাপারে শিক্ষাবিদগণ একমত। ব্রায়ণ্য শিক্ষাব্যবস্থায় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই তিনটি জাতিকেই শিক্ষাদান করা হত। প্রত্যেকটি জাতি তাদের বৃত্তিভিত্তিক শিক্ষা গ্রহণ করত ও অনুশীলনের ফলে তারা কোনাে কোনাে বৃত্তিতে পারঙ্গম হয়ে উঠত।
13. গৃহ পরিবেশ থেকে সম্পর্কহীনতা: গৃহ পরিবেশে থাকার ফলে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় গৃহ বা পরিবেশের সুখ দুঃখ, অভাব-অভিযােগ বা নানা সাংসারিক সমস্যায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে হয়। কোনাে কোনাে সময় এতে পঠনপাঠনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। একনিষ্ঠভাবে পঠন পাঠনের জন্য গুরুগৃহে বা অন্তেবাস একান্ত প্রয়ােজন।
5) বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ব্রাহ্মণ্য শিক্ষার আদর্শ কতখানি গ্রহণযােগ্য ? ব্রাক্ষ্মণ শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটিগুলি লিখুন।
(How far the ideal of Brahmanic education system is acceptable in modern education system? Write down the defects in Brahmanic education system.)
Ans, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে বােধ করি কোনাে আদহ গ্রহণযােগ্য বলে মনে হয় না। অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামােয় যে পরিবর্তন এসেছে তাতে এই ব্যবস্থার বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে নানা প্রশ্ন জাগে। সেগুলি একে একে আলােচনা করছি |
1.আবাসিক শিক্ষা ব্যবস্থা : অনেকেই আবাসিক শিক্ষা ব্যথার উৎকর্ষের কথা আলোচনা করেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা ভাবা দরকার।
(ক) শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক অবস্থাব্রাহ্ণ্যযুগে শিক্ষার্থীদের ভার নিতেন অধ্যাপক। অধ্যাপক বা গুরু তার আশ্রম চালাতেন রাজা, জমিদার বা অভিজাতদের অকৃপণ দানে। উপরন্তু ছাত্রদের প্রতিদিন ভিক্ষায় বেরােতে হত। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের হােস্টেলে রাখতে হলে পরিবারের আর্থিক অবস্থা যথেষ্ট ভালাে হওয়া দরকার।
(খ) আবাসিক শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থান (space) এর ব্যাপার আছে। বিভিন্ন স্কুলে ছাত্রদের রাখার মতাে স্থান নেই আর প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পক্ষে থাকাও সম্ভব নয়।
(গ) বর্তমানে বিশেষধর্মী শিক্ষার (specialised) যুগে ছাত্রাবাসে সব বিষয়ের শিক্ষক থাকার ব্যবস্থা রাখা অসম্ভব ব্যাপার। এছাড়া আরও নানা কারণে আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে অচল বলে মনে হয়।
2. গুরু-শিষ্য বা ছাত্রশিক্ষক সম্পর্ক : অনেকে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের কথা বলেন। বর্তমানে শিক্ষক ছাত্রের আনুপাতিক হার এত বিশাল যে শিক্ষকরা প্রত্যেকটি ছাত্রের সঙ্গে ঠিকমতাে পরিচিত হতে পারেন না। এর ফলে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক প্রীতিপূর্ণ হয়ে ওঠার সুযােগ পায় না।
3.অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা : সামাজিক পরিকাঠামো এটি একটি অসম্ভব ব্যাপার। বর্তমানে শিক্ষাকে আর সরকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। তাই ব্যবস্থাকে সামাল দেবার জন্য শিক্ষার বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে দেবার চিন্তাভাবনা চলছে। বর্তমানে বিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত যে অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন আছে সেটা আর সরকারের পক্ষে চালানাে সম্ভব হচ্ছে না। অতএব এই রীতিটিও গ্রহণযোগ্য নয়।
4. প্রাকৃতিক পরিবেশ: উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে শিক্ষাদান আর মােটেই সম্ভব নয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অধিক বাসম্থানের প্রয়ােজন হয়ে পড়েছে। তাই মুক্ত পরিবেশে প্রতিষ্ঠান গড়ে তােলা বর্তমানে একান্ত অসম্ভব ব্যাপার।
ব্রায়ণ্যশিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি
1. ব্রায়ণ্য শিক্ষা ব্যবস্থায় গুরুবাক্য বা শাস্ত্রকেই শেষ কথা বলে মনে করা হত। দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনুসারে ও সংস্কারপন্থী (narrow and conservative in outlook)। শিক্ষার্থীদের কল্পনাশক্তি, যুক্তিশক্তি ও বিচারশক্তির উপর কোনাে গুরুত্ব আরোপ করা হত This system encouraged artificiality instead of originality)
2. ব্রাহ্মণদের দ্বারা পুরাে শিক্ষাব্যবস্থাটাই নিয়ন্ত্রিত হত বলে শিক্ষার পুরাে ব্যাপারটাই ব্রায়ণের একচেটিয়া (Monopoly) ব্যাপার ছিল। এই ব্যবস্থা তাদের ঔদ্ধত্য এর জন্ম দিয়েছিল। এতে নীচ সম্প্রদায়ের মানুষরা শিক্ষালাভে বঞ্চিত হত। শিক্ষার প্রসার ঘটত না।
3. পাঠ্যক্রমে অন্যান্য বিষয়ের পঠনপাঠনের কথা বলা হলেও ধর্মীয় শিক্ষার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হত। জীবনমুখী বা ব্যবহারিক শিক্ষার যথেষ্ট অভাব ছিল।
4. বৃত্তিমূলক শিক্ষা বা শিল্প শিক্ষা যথেষ্ট অবহেলিত ছিল।
5. বেদপাঠ, যজ্ঞ, আহুতি প্রভৃতির ফলে মনন চিন্তনের চেয়ে আচারধর্মী শিক্ষার উৎকর্ষ দেখা দিয়েছিল।
6. দীর্ঘদিন গুরুগৃহে বাস করাও একটা বিশেষ অসুবিধার দিক ছিল।
7. আচার অনুষ্ঠানগুলি প্রাধান্য পাওয়ায় সেগুলিকে ভিত্তি করে বহু শাস্ত্রগ্রন্থ পরবর্তীকালে রচিত হয়ে পাঠ্যক্রমে বিশালতা এনে দেয়।
8. শিক্ষার সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি জাতির সার্বিক উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
6. শিক্ষকের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যগুলি বা গুণাবলি বর্ণনা করুন।
(Describe various personal characteristics/qualities of teachers.)
Ans. ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যাবলি হল
1. শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র (Personality & Character of Teacher): স্বামী বিবেকানন্দ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের উপর। শিক্ষক মনেপ্রাণে পবিত্র হবেন। নিস্পাপ চরিত্রই শিক্ষকের কথায় শক্তি আনতে পারে। শিক্ষকের কথার সঙ্গে তার আচরণের যেন সংগতি থাকে। শিক্ষাধারা শিক্ষকের মুখের কথায় চলে না—তার প্রাণের কথায় চলে। গান্ধী বলেন—“Woe to the teacher who teaches one thing with the lips and carries another in the heart." অর্থাৎ যিনি কথায় যা বলেন তা করেন না সেই শিক্ষকের প্রতি দুঃখ হয়। রাজেন্দ্রপ্রসাদ লেখেন—"Their (teachers) character should be such that there is no difference between what they say and do." অর্থাৎ তাদের চরিত্রে, কথায় ও কাজে কোনাে পার্থক্য থাকবে না।
প্রশান্ত ও সুদৃঢ় ব্যক্তিত্ব, প্রসন্নতা ও সহিমুতা সার্থক শিক্ষকের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। সহায়তা, আন্তরিকতা, সংবেদনশীলতা আবেগগত সংগঠন সার্থক শিক্ষকের জন্য একান্ত প্রয়ােজনীয়। স্নেহপ্রীতিতে শিক্ষকের হৃদয় মন সর্বদা মুখরিত থাকবে। নয়নের দৃষ্টিতে আলাে, আনন্দ স্নেহ প্রসন্নতা উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। বিদ্যার্থীর মনপ্রাণ ভরে উঠবে। এমনি হবে শিক্ষকের মানসিক গঠন ও ব্যক্তিত্ব।
2. পেশার প্রতি ভালােবাসা (Love to the Profession): কেবলমাত্র অর্থ উপার্জনই শিক্ষকতা পেশা গ্রহণের উদ্দেশ্য হতে পারে না। একজন শিক্ষক প্রথমে শিক্ষক হবেন এবং শেষেও শিক্ষক থাকবেন। মার্ক পেটিসন (Mark Pattison) বলুন-"The first condition of a good teacher is that he shall be trained as a teacher and not brought to serve other profession." অর্থাৎ, একজন শিক্ষক শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষিত হবেন, অন্য কোনাে কাজ করার জন্য নয়।
বালকৃয় যােশী (S Balakrishna Joshi)র মতে- পরিসেবামূলক কাজের প্রতি আগ্রহী একদল একনিষ্ঠ শিক্ষক ব্যতীত সমস্তরকম সুযােগ সুবিধাযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেন প্রাণ ছাড়া সুন্দর মৃতদেহ, আত্মা ছাড়া কঙ্কাল।
3. জ্ঞানার্জন স্পৃহা (Learning to Know): রবীন্দ্রনাথ-এর কথায় বলা যায়—একজন শিক্ষক নিজে ক্রমাগত শিক্ষাগ্রহণ না করলে কখনােই প্রকৃত অর্থে শিক্ষাদান করতে পারেন না, একটি প্রদীপ অন্য প্রদীপকে তখনই প্রজুলিত করতে পারে যখন সে নিজ শিখায় দীপামান থাকে।
জে জে ফিডালে JJ Findly) মন্তব্য করেন—শিক্ষকের সতত শিক্ষার্থী থাকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ
-"Education to those who gives their lives to it, is a joyous adventure just because the teacher is ever a learner." মাটিন (Martin) বলেন, একজন ভালাে শিক্ষক হতে হলে ভালাে ছাত্র হতে হবে।
4. শারীরিক বৈশিষ্ট্য (Physical Characteristics): শারীরিক সুস্থতা সুশিক্ষকের প্রাথমিক গুণ কারণ সুস্থ দেহেই সুস্থ মনের নিবাস (Sound mind in a sound body)। এই প্রসঙ্গে একথাও সত্য যে সুশিক্ষকের ইন্দ্রিয়গুলি পরিমার্জিত হবেই কারণ ইন্দ্রিয়নিচয় জ্ঞান অর্জনের উপায় স্বরূপ-Sense organs are the gateways of the knowledge.
স্বাস্থ্যের পর যা সবচেয়ে প্রয়ােজন, তা হল সুস্পষ্ট উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গি, এর সঙ্গে কণ্ঠস্বরের সম্পর্ক আছে। সুশিক্ষক ঠিকমতাে শুনবেন, দেখবেন ও কথা বলবেন স্পষ্ট উচ্চারণ এর তার আবশ্যিক গুণ।
5. মানসিক সামর্থ্য (Mental Ability): মানসিক প্রক্রিয়ার তিনটি প্রধান ধরন হল জানা বা বােঝা, অনুভব করা ও কর্মে প্রয়ােগ করা। এই জানা বা বােঝার জন্য প্রয়ােজন উন্নত বুদ্ধি অর্থাৎ উচ্চ বুদ্ধ্যঙ্ক (IQ)। শিক্ষক হতে গেলে বুদ্ধি হবে ক্ষুরধার শাণিত-প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের অধিকারী। ছাত্রছাত্রীদের ভালােমন্দের প্রতি তিনি সজাগ ও সদাসতর্ক দৃষ্টি দিতে সক্ষম হবেন। বৌদ্ধিক দিক থেকে উন্নত না হলে জ্ঞান সাধনায় ব্রতী হওয়া সম্ভব নয় বিদ্যোর্থীদের জীবন গড়ার দায়িত্ব বহন করাও সম্ভব নয়। তাই উন্নত বুদ্ধি শিক্ষকের একটি আবশ্যিক গুণ।
6. প্রাক্ষোভিক বৈশিষ্ট্য (Emotional Characteristics): বুদ্ধির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত মানসিক গঠনের অপরিহার্য উপাদান প্রক্ষোভমূলক দিক। শিক্ষকের প্রাক্ষোভিক প্রতিক্রিয়াগুলি হবে সুনিয়ন্ত্রিত, সার্থক অভিযোজনের জন্য তার ব্যক্তিত্বে থাকবে নমনীয়তা। ক্ষোভিত আচরণেও শিক্ষক হবেন সুসংগতিসম্পন্ন (Balanced and adjusted)। শিক্ষক আচার্য-তার আচরণ ধারাই সঞ্চারিত হবে নতুন প্রজন্মে।
এ ছাড়া শিক্ষক হবেন বিদ্যার্থীদের নিয়ন্তা। প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের মনের উপর প্রভাব বিস্তার করেন। অনুকরণ, অনুভাবন ও অনুবেদন (Imitation suggestion and sympathy) মনের এই তিনটি বৈশিষ্ট্য ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে প্রভূত পরিমাণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। অর্থাৎ বিদ্যার্থী শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করে, সঞ্চালিত হয় শিক্ষকের অনুভূতি শিক্ষার্থীর মধ্যে ও শিক্ষকের কাজকর্মও অনুকরণ করে শিক্ষার্থী। অর্থাৎ ভাবনার সঞ্চালন (Transfer of thought) অনুভবের সঞ্চালন ভাবতে প্রাথমিক শিক্ষায় সামাজিক ও কৃষ্টিমূলক দুষ্টিভি (Transfer of feeling) (Transfer of action)- free শিক্ষার্থীর মধ্যে সঞ্চারিত হতে পারে। শিক্ষক হলেন বিদ্যার্থীদের নেতৃস্থানীয়।
7.শিক্ষক হলেন রোল মডেল (Teacher is the Role Model): শিক্ষক রোল মডেলের ভূমিকা পালন করেন। তার বিশ্বাস, আচার-আচরণ ইত্যাদি বিদ্যার্থীদের উপর প্রভাস বিস্তার করে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের উপমিতি প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে বিদ্যার্থী মানসলোক প্রভাবিত করে। অভাবন ও অনুবেদনের মধ্যে দিয়ে শিক্ষকের অনুচ্ঠারি অনেক প্রতিবেদন বিজ্যার্থীর মধ্যে অনুরণিত হতে থাকে। শিক্ষকের আনন্দময় ব্যক্তিত্ব বিদ্যাীর মধ্যে আনন্দের ভাব সঞ্চার করে। শিক্ষকের বিশ্বস্ততা ও বিরক্তি ছাত্রছাত্রীদের মলিন ? তুলতে পারে। এ যেন অনেকটা সেই সেতারের তারে ঝংকারের তােমার মতাে। শিক্ষকের বাকি শিক্ষার্থীর সেই তারে ঝংকার তােলে যে-তারে যে-সুরে শিক্ষকের ব্যক্তি, তার ভাবনাচি বাধা রয়েছে। কোন কিছু না বলেও, শিক্ষক এমনিভাবে তার ভাবনাচিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি বিস্যা্ী মধ্যে সঞ্কার করতে পারেন। শিক্ষকের প্রাণ শিক্ষার্থীর প্রাণে; নীরব অনুবেদনে, আন্দোলন নি়ে আসে, দাগ কেটে যায়। "...শিক্ষার দ্বারা শিক্ষা জুলিয়া ওঠে, প্রাণের দ্বারাই প্রাণ সত্যায়িত হইয়া থাকে।
8. রসসৃষ্টির ক্ষমতা (Sense of Humour): শিক্ষক হবেন সদাপ্রসন্ন, মিতবাক কি? প্রয়োজনে হাসাতে পারেন। নির্মল আনন্দ বিতরণের কারুশিল্পী হবেন শিক্ষক। তিনি পঠনপাঠনের মাঝে হাস্যরসের সৃষ্টি করে বিদ্যার্থীদের প্রাণবন্ত ও সজীব করে তুলবেন শিক্ষকের নির্মল চরিত্রমাধুর্য, তার সত্যনিষ্ঠ সমদৃষ্টি থেকে বিমল প্রাণের আলাে বিদ্যার্থী মধ্যে বিচ্ছুরিত হয়। ক্লাসরুম আনন্দের আর হয়ে ওঠে।
9.আত্মপ্রত্যয় ও বাস্তববুদ্ধি (Self-confidence and Practical Intelligence): শিক্ষক হবেন আত্মপ্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠিত। অহংকার নয়, আত্মম্ভরিতা নয়—আত্মবিশ্বাস আব্মশ্রায় শিক্ষক হবেন সুদৃঢ়, অথচ বিনম্র। শিক্ষককে বিদ্যালয়ের ছাত্র অসন্তোষসহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এসব অবস্থায শিক্ষককে আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে উপস্থিত বুদ্ধি ও অন্তদৃষ্টি দিয়ে অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা প্রহণ ব্রাতে হয়। উপস্থিত বুদ্ধি, অন্তদৃষ্টি ও সমস্যাসমাধানের জনা বাস্তব বুদ্ধি ও কৌশল থাকা একজন সার্থক শিক্ষকের পক্ষে একান্তভাবে প্রয়ােজনীয়।
10, মানবিক গুণ (Human Qualities): শিক্ষকের কতকগুলি বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে দরকার। যেমন—শিক্ষক হবেন ভাবপ্রবণ, স্বাধীন চিন্তাভাবনার অধিকারী, ক্ষমাশীল ও তার তিতিক্ষ্য থাকবে। এগুলি সবই মানবিক গুণ। মর্যাদাবােধের সঙ্গে এগুলি যুক্ত হলে একটি পূর্ণ সমন্বিত ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। শিক্ষক এই গুণগুলোর অধিকারী হলে শিক্ষকতা কাজটি অনেক সাবলীল গতিতে নিষ্পন্ন হতে পারে।
শিক্ষকের উপরোন্ত গুণগুলি অধিকাংশই ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রকেন্দ্রিক। আর ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে বংশধারা ও পরিবেশ শক্তির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে। বুদ্ধি, প্রবণতা, প্রাক্ষোভিক সংগঠন, দৈহিক ও মানসিক গঠন—এর সবটাই প্রায় বংশধারায় প্রাপ্ত গুণাগুণ। কিন্তু তাই বলে এর উপর পরিবেশ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাব নেই, একথা কখনােই বলা চলে না। তে বংশধারার শক্তি এখানে প্রবল।
7. শিক্ষকের পেশাগত বৈশিষ্ট্যাবলি বা গুণাবলী বর্ণনা করুন।
(Describe various Professional characteristics/qualities of teachers.)
Ans: পেশাগত বৈশিষ্ট্য: অনার্জিত গুণাবলি ছাড়াও শিক্ষকের কতকগুলি গুণাগুণ আছে যেগুলি অর্জন করতে হয়, আয়ত্ত করতে হয়। এদের পেশাগত বৈশিষ্ট্য বলা যায়। যেমন শিক্ষকের জীবনদর্শন, দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষাবিষয়ক জ্ঞান, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান, শিক্ষা ও বৃত্তি নির্দেশনা সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান—এ সকলই সুশিক্ষক হওয়ার জন্য অর্জন করতে হয়, আয়ত্ত করতে হয়। এক্ষেত্রে পরিবেশের প্রভাব বেশি। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাবও এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।
1. বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান (Through Knowledge about the Subject): শিক্ষকের তাঁর বিষয়টি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকবে। তিনি জ্ঞানতপসী হবেন। তবেই বিদ্যার্থীর মধ্যে জানার ইচ্ছাকে উদবােধিত করতে পারবেন। যে দীপ জ্বেলে না, সে তাে অন্য দীপকে প্রজ্বলিত করতে পারে না। তাই তিনি জানবেন সব কিছু জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। আজ বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে অভূতপূর্ব জ্ঞানের বিস্ফোরণ হচ্ছে, জ্ঞান বিজ্ঞানের শাখা প্রশাখা বিস্তৃত হচ্ছে চারিদিকে, শিক্ষককে সেগুলি সম্পর্কে অবহিত হতে হবে।
2. মনােবিদ্যার জ্ঞান (Knowledge of Psychology): শিক্ষণীয় বিষয়টি সম্পর্কে জানলেই শুধু চলবে না, শিক্ষককে শিক্ষার্থীর মনটিকে জানতে হবে। শিক্ষকের শিশু-মনস্তত্ত্ব সংক্রান্ত জ্ঞান, শিশুদের বিকাশ-বৃদ্ধি, আচার-আচরণ, বংশধারা ও পরিবেশের প্রভাবে শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠন, বুঝতে হয়। শিশুর প্রবৃত্তি আবেগ, এদের নিয়ন্ত্রণ করার উপায়এ সকল বিষয়ে শিক্ষক সম্যক অবগত হবেন। অন্যথায় সময়, পদ্ধতি, শক্তি এবং মানব সম্পদ অপচয় হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এইসব তথ্য শিক্ষক শিক্ষামনােবিদ্যা, বিশেষ করে বিকাশমূলক মনোবিদ্যা থেকে অবহিত হবেন। মন্তেসরি লিখেছেন The border the teacher's scientific culture and practice in experimental psychology, the sooner will come for her the marvel of unfolding life and her interest in it. অর্থাৎ শিক্ষকের যত বিজ্ঞান ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরীক্ষামূলক মনোবিজ্ঞানের উপর চর্চা থাকবে ততই সে শিশুর জীবনের বন্ধ দুয়ারগুলি খুলতে পারবে এবং তার আগ্রহ দেখা দেবে।
এ ছাড়া শারীরবিদ্যা ও সমাজবিদ্যা সম্বন্ধে শিক্ষকের জ্ঞান অর্জন প্রয়ােজন। এই সকল বিষয়ে যথােচিত জ্ঞান থাকলেই তিনি শিক্ষার্থীর ব্যবহারকে সঠিকভাবে বুঝতে পারেন ও তাকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। শিক্ষক হলেন জীবনশিল্পী। শিশুর সমগ্র জীবনকে শিল্পায়িত করাই শিক্ষকের কাজ।
3. পদ্ধতি সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান (Scientific Knowledge about Method of Teaching): শিক্ষক-জীবনে যে যে গুণ বা চিত্তবৃত্তির প্রয়ােজন তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযােগ্য হল বিষয় উপস্থাপনের নৈপুণ্য। শিক্ষক মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে শ্রেণিকক্ষে বিদ্যার্থীদের পুরােনাে অভিজ্ঞতার ভিত্তির উপর, তাদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিষয়বস্তুটির অবতারণা করবেন। এ বিষয়ে শিক্ষকের দক্ষতা থাকা প্রয়ােজন।
এ ছাড়া শিক্ষাদানের কতকগুলি নীতি সম্পর্কে তাকে অবহিত হতে হবে। যেমন—জানা থেকে অজানায় যাওয়া, মৃত বস্তু থেকে অমূর্ত ভাবনায় যাওয়া (Fron Concrete object to abstract thought), পরিচিত থেকে অপরিচিতে যাওয়া (From known to unknown) ইত্যাদি।
পাঠদান-পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষককে সবিশেষ জ্ঞান অর্জন করতে হয়। একজন স্থপতি ভিদ যেমন কোনাে বাড়ি নির্মাণের আগে তার খসড়া পরিকল্পনা করে নেন এবং সেই পরিমানা রচনার জন্য তাকে সদ্য গতিবিদ্যা প্রত্যক্ষভাবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শিক্ষালাভ তে হয়, ঠিক তেমনি পাঠদানের জন্য পাঠ-পরিকল্পনার শিল্পটিকে আয়ত্ত করতে, পাঠ উপস্থাপন পর্বকে সাফল্যের সাথে সমাধা করতে, নির্দিষ্ট প্রত্যক্ষ শিক্ষালাভ করতে হয়।
তা ছাড়া বর্তমানে বহু নতুন নতুন শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা হচ্ছ। শ্রেণিকক্ষে ব্যবহারযােগ্য মাধ্যমগুলি মধ্যে কম্পিউটার, Programmed text. Interactive video, motion pictures, অডিয়াে-ভিডিয়াে ক্যাসেটস Film-strip, overhead projectors ইত্যাদি উল্লেখযােগ্য। শিক্ষককে তার বিষয়বস্তু, শ্রেণিকক্ষটির অবস্থা, বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো, বিদ্যার্থীদের যােগ্যতা এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এইসব মাধ্যমগুলির মধ্যে থেকে বেছে নিতে হবে। এর দ্বারা শিক্ষার্থী শ্রবণ, মনন ও ধ্যানের সাহায্যে পাঠাবিষয়কে উপলব্ধি করতে পারবে।
4. প্রশ্নকরণে দক্ষতা (Questioning Skill): প্রাচীনকাল থেকেই প্রশ্ন ও পরিপ্রশ্নের মাধ্যমে শিক্ষাদানকে উৎকৃষ্ট পদ্ধতি বলে মনে করা হয়। এটি সক্রেটিক পদ্ধতি নামে খ্যাত। অ্যারিস্টটল শিক্ষায় যৌক্তিক পদ্ধতি অর্থাৎ আরােহ-অবরােহ পদ্ধতির কথা বলেন। শিক্ষক প্রশ্নকরণে দক্ষতা অর্জন করবেন। প্রশ্নের মধ্য দিয়ে শিক্ষক ছাত্রের মূল্যায়ন করবেন। বিদ্যার্থীর অসুবিধা কোথায়, কেন তার অসুবিধা হচ্ছে এইসব তথ্য সংগ্রহ করে শিক্ষক তার পাঠদান পদ্ধতি সংশােধন করবেন। এ ছাড়া সঠিক প্রশ্ন সঠিকভাবে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শ্রেণিকক্ষকে শিক্ষক আরও গতিশীল করে তুলতে পারেন। শিক্ষায় প্রযুক্তির অর্থ তাে কোনাে যান্ত্রিক ব্যবস্থা। নয়, শিক্ষার বিষয়টিকে বাস্তবক্ষেত্রে মনােজ্ঞ করে তােলা।
5. মূল্যায়ন (Evaluation): শেখানাের পর আসে অভীক্ষা, মূল্যায়নের কথা। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র দেখা, উত্তরপত্রগুলিকে মান অনুযায়ী চিহ্নিত করা শিক্ষকেরই কাজ-এর জন্য দক্ষতা থাকতে হবে, বা প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে শিক্ষক এ বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করবেন ও বাস্তবে প্রয়োগ করবেন।
শিক্ষার্থীর শক্তি-সামর্থ্য, তার প্রবণতা, ব্যক্তিত্বের সংগঠন—এসব বিষয়ের পরিমাপ ও মূল্যায়নের জন্য বস্তুনিষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক অভীক্ষার সম্পর্কে জ্ঞান ও তার প্রয়ােগ কৌশল শিক্ষককে আয়ত্ত করতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষা-নির্দেশনা ও বৃত্তি-নির্দেশনার কৌশলও তাকে আয়ত্ত করতে হবে। এর জন্য বিদ্যালয়ে সর্বাত্মক পরিচয় লিপি কী করে রাখতে হয় সে বিষয়ে শিক্ষক অবহিত হবেন।
এ ছাড়া অস্বভাবী শিশু, প্রতিভাবান শিশু, সমস্যামূলক শিশু ক্ষীণ বুদ্ধি সম্পন্ন শিশু বা মূক বধির বা অন্ধ শিশু এদের জন্য বিশেষ পাঠক্রম বিশেষ পাঠদান পদ্ধতি, সমাজে এদের পুনর্বাসন এ সকল বিষয় বর্তমানে শিক্ষকদের সম্যক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন প্রয়ােজন।
6. গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি (Democratic Outlook): অতীতের মতাে বর্তমানে শিক্ষকের আর একাধিপত্য নেই। বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা গণতান্ত্রিক আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত। শুধু গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা করলেই চলবে না, প্রতিটি কাজে শিক্ষকের গণতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। সাম্য, স্বাধীনতা ও মৈত্রীর নীতিগুলি তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিফলিত করবেন।
এজন্য শিক্ষক ধর্মীয় গৌড়ামি থেকে মুক্ত হবেন। ধর্মীয় চেতনাসম্পন্ন হবেন কিন্তু কখনােই ধর্মান্ধ হবেন না। তিনি সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতি থেকে শিক্ষালয়কে মু্ত রাখবেন। সমাজের বৃহত্তর ক্ষেত্রে শিক্ষক রাজনীতি করতে পারেন, কিন্তু বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে তা কথনােই করবেন না।
7,বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যকর ও সুন্দর পরিবেশ রচনা (Creation of Healthy and Beautiful Environment in the School): সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ রচনার জন্য শিক্ষককে যথার্থভাবে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এরজন্য বিদ্যালয়ের সহ-পাঠক্রমিক কর্মসুচি প্রস্তুত করা ও তার যথার্থ রূপায়ণের জন্য শিক্ষককে সর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিদ্যার্থীদের দেহ-মনের সুষম বিকাশের উদ্দেশ্যে শিক্ষক বিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করবেন।
এ ছাড়া সুষম ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য বিদ্যার্থীর গৃহ পরিবেশ যাতে সুস্থ ও বিদ্যালয় কর্মসূচি বূপায়ণের সহায়ক হয় তার জন্য গৃহ ও বিদ্যালয়ের মধ্যে সেতুবন্ধ স্থাপন করতে হবে। এজন্য শিক্ষক-অভিভাবক সংস্থা গঠন করার জন্য শিক্ষককে দায়িত্ব নিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়—শিক্ষককে সর্বদা শিক্ষার্থী সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীকে ঠিকভাবে জানা ও বোঝা শিক্ষকের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য। বিদ্যার্থীর সঙ্গে মিলে মিশে তাকে জানা, শিশুকে জানা ও বিদ্যালয়ের সমগ্র পরিবেশ ও কর্মকাণ্ডকে বিদ্যার্থীর বিকাশ উপযােগী করে গড়ে তােলার দায়িত্ব শিক্ষকের-এরজন্য শিক্ষককে সর্বপ্রথম যা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে শিখতে হবে তা হল শিশুকে, শিশুর মানসলােককে জানা, তার জন্য মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করা। A child is a book which the teacher is to learn from page"—শিক্ষকের কর্তব্য সম্বন্ধে রুশাের এই বক্তব্যটি বিশেষভাবে প্রণিধানযােগ্য।
শিক্ষক দেহ ও মনে পরিচ্ছন্ন হবেন। তার মননশীলতা, শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তরিক মমতবােধ, শিক্ষণকে কেবল জীবিকার উপায় হিসেবে গ্রহণ না করে, জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করবেন। যে শিক্ষক যত পঠন পাঠনে মগ্ন, নিষ্ঠাবান, নিয়মানুবর্তী ও আন্তরিক তার ছাত্রদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা তত বেশি, ছাত্রদের হৃদয়ে তার স্থান চিরকালের। সেবাধর্মী মনোভাব (Missionary Zeal) উন্নত জীবনাদর্শের বিশ্বাস, সামাজিক দায়িত্ববোধ, প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী শিক্ষকের কাছে শিক্ষাদান এক স্বাভাবিক
আনন্দদায়ক প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে।
8. শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের ভূমিকা আলােচনা করুন।
(Discuss the role of teachers in teaching process.)
Ans. শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আগে শিক্ষণ প্রক্রিয়াকে দ্বিমুখী প্রক্রিয়া বলে মনে করা হত। আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানে শিক্ষণ প্রক্রিয়াকে বহুমুখী বলে উল্লেখ করা হয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পাঠক্রম, শিক্ষণকৌশল ইত্যাদি সবই শিক্ষণ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। দ্বিমুখী বহুমুখী যাই
হােক না কেন শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের ভূমিকা সর্বক্ষেত্রেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক শিক্ষণ প্রক্রিয়ার নেতা–খার দক্ষতা শিখন প্রক্রিয়ার সফলতা নিয়ে আসে। শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের ভূমিকা প্রধানত তিনটি-
1.সহায়ক হিসেবে শিক্ষক (Teacher as a facilitator)।
2 সংযােগকারী হিসেবে শিক্ষক (Teacher as a communicator) এবং
3.মাধ্যম হিসেবে শিক্ষক (Teacher as a mediator)।
1 সহায়ক হিসেবে শিক্ষক (Teacher as a Facilitator)
শিক্ষক পাঠ্য বিষয়কে সহজ ও সুষ্ঠভাবে বিদ্যার্থীদের নিকট তুলে ধরেন। বিষয়বস্তুকে ও মনস্তত্ত্ব যুক্তিসম্মতভাবে সংগঠিত করে শিক্ষার্থীদের শিখনকে সহজ করে তােলে। বিদ্যার্থীদের বয়স
বােধগম্যতার স্তর এবং পাঠ্য বিষয়ের চাহিদা অনুযায়ী তিনি পাঠদানের কৌশল স্থির করেন।প্রশ্নোত্তরকালে শিক্ষক প্রয়ােজনমতাে সংকেত সরবরাহ করেন।
অনেক সময় কোনাে কোনাে শিক্ষার্থী বিভিন্ন কারণে শ্রেণিকক্ষে সক্রিয় হয় না। এ ধরনের শিক্ষার্থীরা যাতে সমস্ত রকমের বাধা অতিক্রম করে স্বাভাবিক শিক্ষার্থীর মতাে আচরণ করে । সে ব্যাপারে শিক্ষক উপযুক্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করেন। দুর্বল বিদ্যার্থীদের সংশােধনমূলক ব্যবস্থা করবেন শিক্ষক।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের ব্যাখ্যা যদি বিদ্যার্থীরা বুঝতে না পারে তাহলে তিনি বিষয়টিকে ক্ষুদ্র ক্ষু্ অংশে বিভক্ত করে শিক্ষার্থীদের বােঝাবার মতাে করে উপস্থাপন করবেন। শিখন পরিস্থিতি যাতে শিখনের অনুকুল হয় তা রচনায় তিনি সচেষ্ট হন। প্রয়ােজনে তিনি বক্তব্যকে একাধিকবার উপস্থাপন করেন। নতুন জ্ঞানকে অর্জিত জ্ঞানের সঙ্গে সমন্বিত করে উপস্থাপন করেন।
2.সংযােগকারী হিসেবে শিক্ষক (Teacher as a Communicator)
সহজ ও সরল ভাষা ব্যবহার করে, আধুনিক শিক্ষা উপকরণের সাহায্যে শিক্ষক পাঠ্য বিষয়টি বিদ্যার্থীদের সামনে উপস্থিত করেন—এখানে শিক্ষক সংযােগরক্ষাকারী। বিশেষ তথ্য, জ্ঞান ও দক্ষতা আয়ত্ত করার জন্য বিদ্যার্থীদের মধ্যে প্রেরণা সঞ্চার ও মনােযােগী ও অনুভূতিশীল করে তােলেন, যাতে বিদ্যার্থীরা নানা কারণে শ্রেণিকক্ষে নিষ্ক্রিয় থাকে, তাদের সক্রিয় করে তুলতে শিক্ষক বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করেন। সার্থক সংযােগরক্ষাকারীর ভূমিকা পালন করার জন্য শিক্ষক বিভিন্ন ধরনের উপকরণের সাহায্য নেন। যেমন—চার্ট, মডেল, প্রােজেক্ট,অডিয়াে/ভিডিয়াে ক্যাসেট, টেপরেকর্ডার, ভিডিয়াে ইত্যাদি। উত্তম সংযােগরক্ষার জন্য শিক্ষক পাঠদান কৌশল ব্যবহারে নমনীয়তা অবলম্বন করেন। কখনও বক্তব্য রাখেন, কখনও আলােচনা করেন, কখনও বা প্রদর্শন করেন।
সংযােগরক্ষার ক্ষেত্রে তথ্য প্রেরণাকারী এবং তথ্য গ্রহণকারী উভয়েই সক্রিয় হলে সংযােগ একদিকে যেমন শক্তিশালী হয়, অন্যদিকে তেমনি স্থায়ী হয়। শিক্ষক প্রেরণকারী, গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সক্রিয় করে তুলতে প্রশ্ন করেন।
এ ছাড়া গ্রহণকারী যখন জানতে পারে, সে কতটুকু গ্রহণে সক্ষম হয়েছে তাহলে সে তথ। গ্রহণে আরও সক্রিয় হয় এবং সংযােগরক্ষার কাজটি সার্থক হয়। এজন্য শিক্ষক মাঝে মাঝেই বিদ্যার্থীদের অবহিত করেন তারা কী পরিমাণ তথ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। একেই আমরা ফিডব্যাক (Feedback) বলি।
শিক্ষক কেবলমাত্র জ্ঞান সঞ্চালন করেন না। শিক্ষাদানকালে তার আবেগ, অনুভূতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চালিত হয় যার ফলে বিদ্যার্থীরা শিক্ষা-শিখন প্রক্রিয়ায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে এবং সংযােগরক্ষার কাজটি আরও শক্তিশালী হয়।
শিক্ষকের সংযােগরক্ষার কাজটি শুধুমাত্র ক্লাসরুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্লাসরুমের বাইরেও এর প্রভাব কাজ করে। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নিকট 'রােল-মডেল। তাঁর আদর্শ, পরামর্শ শিক্ষার্থীরা অনুসরণ করে এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আচরণে প্রতিফলন ঘটায়। অর্থাৎ শিক্ষক শুধু প্রত্যক্ষভাবে শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় সংযােগ রক্ষা করেন তা নয়-পরােক্ষভাবেও সংযােগ রক্ষা করে থাকেন। আসলে শিক্ষক সংযােগ রক্ষার দায়িত্ব যত সুষ্ঠুভাবে পালন করেন শিক্ষণ প্রক্রিয়ার উৎকর্ষতার মাত্রা তত বৃদ্ধি পায়।
3. সহায়ক হিসেবে শিক্ষক (Teacher as a Mediator)
শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক সজীব মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন। পাঠক্রম সন্ালনের দায়িত্ব শিক্ষকের। তিনি পরিস্থিতি বিবেচনা করে, বিদ্যার্থীদের অনুযায়ী বিষয়বস্তু বিন্যাস করে বিদ্যার্থীদের পোঁছে দেন। বিদ্যার্থীরা তা আয়ত্ত করে, যার ফলে তার জ্ঞান, বােধ ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। বিদ্যার্থীদের প্রস্তুত করে, আগ্রহ বৃদ্ করে, পূর্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংযােগ ঘটিয়ে সহজ ভাষায় বিষয়বস্তুকে বিদ্যার্থীর নিকট উপস্থাপন করার দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেন। শিক্ষার্থীরা বিষয়বস্তু অনুধাবনে সক্ষম না হলে বিষয়বস্তুকে আরও সহজ করে পুনরায় উপস্থাপন করেন। অন্যান্য মাধ্যম থেকে শিক্ষক-মাধ্যমের এখানেই পার্থক্য।প্রয়ােজনমতাে শিক্ষক শিক্ষা সহায়ক উপকরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য গ্রহণ করেন।
শিক্ষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যম হিসেবে শিক্ষকের ভূমিকা কেবলমাত্র বিষয়বস্তু উপস্থাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীর মধ্যে আবেগ ও অনুভূতি সঞ্চালনের মাধ্যম হিসেবে তিনি কাজ করেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক ও বিষয়ের সঙ্গে একাত্মবােধ করেন। এখানেই শিক্ষক মাধ্যম হিসেবে অন্যান্য যান্ত্রিক মাধ্যম থেকে উন্নত।
9) বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষকের দায়বন্ধতাগুলিকে বর্ণনা করুন।
Describe the duties of a teacher with respect to modern education system.)
Ans. আজ বিশ্বায়নের বাতাবরণে, তথ্যপ্রযুক্তির আবহে, সমাজ-সংস্কৃতির নিত্য পরিবর্তনশীল পরিমণ্ডলে শিক্ষক সমাজের দায়বদ্ধতা অপরিহার্য। ভারতের মতাে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে সামাজিক সমস্যা অনেক। তাদের মধ্যে প্রধান হল ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, অশিক্ষা, সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ, কুসংস্কার ইত্যাদি।
জনসংখ্যা সীমিত করার জন্য সরকারি নানা প্রকল্প আছে, শিক্ষকের কাজ জনসংখ্যা শিক্ষাকে সার্থক করে তােলা। সরকারি নানা উদ্যোগকে সমর্থন করা ও জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানাে শিক্ষকের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
নিরক্ষরতা দূরীকরণ (Eradication of Illiteracy) ভারতবর্ষে দারিদ্র্যের মূল কারণ নিরক্ষরতা, অশিক্ষা ও বেকার সমস্যা। ভারতীয় সংবিধানের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী 14 বছর বয়স পর্যন্ত সকলের জন্য সর্বজনীন, অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করার কথা। কেন্দ্রীয় সরকার 2000 খ্রিস্টাব্দে সর্বশিক্ষা অভিযান (SSA-2000) প্রকল্প চালু করেন। 6-14 বছর বয়স পর্যন্ত আমাদের দেশের সমস্ত শিশুকে ব্যবহার উপযােগী এবং নির্দিষ্ট মানসম্পন্ন ন্যূনতম আবশ্যিক শিক্ষার (অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই প্রকল্পকে বাস্তবায়িত করা শিক্ষকের আবশ্যিক কাজ।
• আবার শিক্ষা ক্ষেত্রে অপচয় ও অনুন্নয়নের (Wastage of Stagnation) হার কে চলেছে। এই বিদ্যালয়ঙুটদের সংখ্যাবৃদ্ধির কারণ শিক্ষালয়গুলি দুরবস্থা, পরিকাঠাতে অভাব, শিক্ষণ পদ্ধতির ত্রুটি, শিক্ষকদের উদাসীনতা ও অক্ষমতা, ত্রুটিপূর্ণ পাঠ ইত্যাদি। বিদ্যালয়ের পরিধির বাইরে শিক্ষকদের এগুলির প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। এরজন্যে প্রথাবহির্ভূত শিক্ষাব্যবস্থার (Open and distance leaming) সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে হবে।
•বয়স্কশিক্ষা (Adult education) নিরক্ষরতা দূরীকরণে বিশেষ উপযােগী—এ বিষয়ে সমাজ-সচেতন শিক্ষক উদ্যোগী হবেন।
•আজ শিক্ষিত/অশিক্ষিত সর্বস্তরে বেকার সমস্যা তীব্র হয়েছে। এ সমস্যার সমাধানে শিক্ষকের এগিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন পেশামূলক প্রশিক্ষণে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করাও শিক্ষকের কাজ। শিক্ষার্থীর প্রবণতা ও আগ্রহ অনুযায়ী তাদের বৃত্তি নির্বাচন কর ক্ষেত্রেও শিক্ষকই হবেন প্রধান নির্দেশক (Counsellor)।
•পরিবার বিদ্যার্থীর প্রথম ও প্রধান শিক্ষালয়। তাই পরিবারের সঙ্গে বিদ্যালয়ের এবং বর মার সঙ্গে শিক্ষক/শিক্ষিকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীণ বিকাশের জন্য এ সম্পর্ক বিশেষ সহায়ক।
•পরিবার ও বিদ্যালয় ছাড়াও শিক্ষার অন্যান্য সংস্থাগুলি যেমন—রাষ্ট্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা, গণমাধ্যম ইত্যাদির সঙ্গে শিক্ষকদের সচেতন থাকতে হবে। তিনি হবেন বিদ্যার্থীর, সমাজের সমগ্র পরিমণ্ডলের নিয়ামকতাই শিক্ষার্থী সমাজের বিভিন্ন দিকগুলি সম্পর্কে শিক্ষকের স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার।
মানবসেবা (Service to the Humanity)
ভারতবর্ষে দরিদ্র অবহেলিত, দুর্দশাগ্রস্ত জনসাধারণের সেবা শিক্ষার একটি অঙ্গ হওয়া উচিত। আজ দুর্ভিক্ষ, মারাত্মক ব্যাধির প্রকোপ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের প্রতিদিনের সশী। এসব ক্ষে শিক্ষকদের কাজ হবে বিভিন্ন সামাজিক সেবামূলক সংস্থার সঙ্গে সহায়তা করা-বিদ্যাীনে সেবাকাজে উদবােধিত করা।
সামাজিক ঐতিহ্য ধরে রাখা (To Preserve and Transmit Social Tradition) সমাজ-সংস্কৃতির ঐতিহ্য ধরে রাখা ও প্রজন্মান্তরে সেই ঐতিহ্যগুলিকে সলিত হয়। শিক্ষকেরই কাজ। সমাজের বিভিন্ন শক্তিগুলির সমন্বয়ন বিনােদনমূলক কাজকর্মের মহে দিয়েই অনেক বেশি কার্যকরী হয়ে থাকে। সংস্কৃতি চর্চার দ্বারাই মানুষ পরস্পরের সঙ্গে মেলবন্ধন অনুভব করে। সমাজ-সংহতি (Social cohesion) নিয়ে আসাই শিক্ষার কাজ-শিক্ষকের কাজ।
আত্মশৃ্খলার পরিবেশ রচনা করা
(To Manipulate Environment of Self Discipline) বর্তমানকালে সামাজিক তথা সার্বিক জীবন পরিবেশ অস্থির অশান্ত হয়ে উঠেছে। আমরা প্রকৃতি থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি বলে কলুষতা শুধু বাতাসে নয়, মানুষের মনের গহনে বাস করছে। পরিবার ভাঙছে, শিশু, কিশাের-কিশােরী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। পথ দেখাবার মতাে কেউ নেই। তাদের ইচ্ছার অবদমন বা কঠোর শাস্তি কখনও মুক্ত শৃঙ্খলা আনেতে পারছে না। আজ শিক্ষক/শিক্ষিকারা অনেক সময়ই শিশু কিশােরদের কঠোর দণ্ড দিচ্ছেন। শিক্ষাবিদরা বলেন—শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা তখনই আসে যখন শিক্ষক/শিক্ষিকা অক্ষম হয়ে পড়েন। "Infliction by punishment is the teachers failure. রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—রাষ্ট্রতন্ত্রেই হােক বা শিক্ষাতন্ত্রেই হােক, কঠোর শাসননীতি শাসয়িতার অযােগ্যতার প্রমাণ। শিক্ষকের উচিত সর্বত্র আত্মশৃঙ্খলার পরিবেশ বজায় রাখা।
আজ শিক্ষকের যে ভূমিকা প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে তা হল সংগঠকের ভূমিকা। কী বিদ্যালয়ে কী জীবনে সর্বত্রই—শিক্ষকের সংগঠনী-প্রতিভার একান্ত প্রয়ােজন। কারণ আমাদের শ্রেণি ও বিদ্যালয় পরিবেশকে অনুকুলে এনে শিক্ষার লক্ষ্যে পৌঁছােতে পারা যায় সেজন্য চেষ্টা করতে হবে। যে বিদ্যালয়ের যতটুকু সংগতি আছে সেই অনুযায়ী বিদ্যার্থী ও অন্যান্য সকলের সহযােগিতা নিয়ে বিদ্যালয় পরিবেশকে যথাসম্ভব সুন্দর করে তােলা যেতে পারে।
সর্বোপরি শিক্ষকই হবেন সমস্ত শিক্ষাপরিবেশের, সমাজের কর্ণধার। আজ বিশ্বনাগরিকত্ব মানুষের অধিকার, তাই শিক্ষকের কাজ সীমাহীন। তিনি সমাজকে যােগ্য নেতৃত্ব দেবেন। তার দার্শনিক ভাবনা, মানবিকতা তাকে সকলের অত্যন্ত আপনজন বলে চিহ্নিত করবে সমাজের কাছে, জাতির কাছে, বিশ্বের দরবারে।
10. প্রাচীন ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের ভূমিকা সংক্রান্ত পার্থক্য বর্ণনা করুন। (Describe the difference in the role of teacher in ancient education system and modern education system.)
Ans. সূচনা (Introduction)
শিক্ষক-শিক্ষার অপরিহার্য উপাদান। শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু শিশু-তাদের চাওয়া-পাওয়া, শক্তি 1. সম্ভাবনাকে সামনে রেখে শিক্ষা দিতে হবে। আর সেই আয়ােজনে শিক্ষকই হলেন পুরােহিত, তাই শিক্ষক শিক্ষার একটি বিশিষ্ট উপাদান। শিক্ষার্থীর ক্রম-পরিণতির পথে শিক্ষকের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকের সামর্থ্য, আন্তরিকতা, পেশাগত দক্ষতা এবং মানসিকতার উপরই সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে। শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকের অবস্থান এবং মর্যাদা সম্পর্কে কোঠারি কমিশনের রিপাের্টে বলা হয়েছে—Of all the different factors which influence the quality of education and its contribution to national development the quality, competence and character of teachers are undoubtedly the most significant. মুদালিয়ার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে-কোনাে ধরনের শিক্ষামূলক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে শিক্ষক হলেন অপরিহার্য উপাদান। হুমায়ুন কবির বলেন—শিক্ষকগণ হলেন জাতির ভাগ্য নিয়ন্ত্রক-শিক্ষার পুনর্গঠনের আসল ব্যক্তিই হলেন শিক্ষক।John Adams - "The teacher is the torch-bearer of the race and guardian of the future mankind. He plays an important role in shaping and moulding the personality of the child".অর্থাৎ শিক্ষক হলেন জাতির আলাে বহনকারী এবং মানবজাতির ভবিষ্যতের রূপকার। জাতীয় শিক্ষানীতিতে (1986) সলা। হয়েছে-মর্যাদার বিচারে শিক্ষকের উর্থে কোনাে মানুষ উঠতে পারে না।
প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের ভূমিকা (Role of Teacher in the Education of Ancient Ages)
প্রাচীন শিক্ষাবাবস্থায় শিক্ষক ছিলেন শিক্ষার কেন্দ্রে। এই সময় মনে করা হত শিক্ষক উ সঞ্জিত জ্ঞান (স্বর্ণভাণ্ডার) বিদ্যার্থীর থলিতে পুর্ণ করে দেবেন। এখানে শিক্ষক ছিলেন সক্রিয় উপাদান, আর শিক্ষার্থী ছিল নিষ্ক্রিয়। বিদ্যার্থীর আগ্রহ, বুচি, সামর্থ্য, প্রবণতা ইত্যাদি ছিল সম্পর্ণ অবহেলিত। প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের নীতি ছিল-Spare the rod and spoil the child। তবে প্রাচীনকালে সমাজ ব্যবস্থায় শিক্ষকের স্থান ছিল অতি উচ্চে। পাশ্চাত্য বা প্রাচ উভয় সমাজেই শিক্ষক যথেষ্ট সম্মানের অধিকারী ছিলেন। পাশ্চাত্য শিক্ষার ক্ষেত্রে চার্চের কর্তৃত ছিল অবিসংবাদিত। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষকের ভূমিকা (Role of Teacher in Modern Education) আধুনিক শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হল শিশু-শিক্ষার মধ্যমণি। তাকে কেন্দ্র করেই ছিল শেষ কথা। চার্চের যাজকবৃন্দ শিক্ষকতা করতেন।
ইসলামি অনুশাসনে উলেমাদের চরিত্রশক্তির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হত। সং চরিত্রবান শিক্ষকের কাছে কঠোর শৃঙ্খলায়। শিক্ষাদান পরিচালিত হত। শিক্ষকগণ কোনাে বেতন নিতেন না।
প্রাচীন হিন্দু সমাজের গুরু ছিলেন পরম শ্রদ্ধার পাত্র। অথর্ব বেদে বলা হয়েছে—পিতামাতা সন্তানের দেহ সৃষ্টি করেছেন। শিক্ষা দিয়েছে আমাদের নতুন জন্ম—আর শিক্ষা আমরা লাভ করেছি গুরুর কাছ থেকে। গুরুকে শুধু শ্রদ্ধাই করা হত না, শিষ্য সম্পূর্ণভাবে গুরুর হাতে নিজেকে সমর্পণ করত।
সে যুগে গুরুর সাহায্য ছাড়া বেদবিদ্যা আয়ত্ত করা ছিল অসম্ভব। বৈদিক শিক্ষা ছিল মৌখিক শুদ্ধ উচ্চারণ ও আবৃত্তির জন্য গুরুর সাহায্য ছিল অপরিহার্য।
প্রাচীন ভারতের আচার্যগণ বিদ্যাকে জীবনের মহত্তম ব্ৰত বলে মনে করতেন। অর্থ,রাজসম্মান, যশ, সবকিছুকে ত্যাগ করে শিক্ষকতাকে যারা জীবনের ব্রত বলে গ্রহণ করেছিলেন,সমাজে তাদের স্থান ছিল সব্বোর্চ- গুরুই ছিলেন সমাজে সর্বাধিক পূজ্য।
আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষকের ভূমিকা (Role of Teacher in Modern Education)
আধুনিক শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হল শিশু-শিক্ষার মধ্যমণি। তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে শিক্ষার পরিবেশ ও পরিমণ্ডল। শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষায় শিক্ষকের ভূমিকা, পাঠক্রম ও পরিবেশ সব কিছুই গড়ে ওঠে শিশু প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে। এ শিক্ষা মূলত স্বতঃশিক্ষা (Auto- education)-শিক্ষক পথনির্দেশক। শিক্ষকের কাজ শিশুমনের বিস্ময়কর আত্মবিকাশ লক্ষ করা। তার গতি নির্দেশ করা এবং আত্মপ্রকাশে সহায়তা করা। শিশু শিক্ষা কৃত্রিম উপায়ে। গড়েপিটে তােলা নয়। শিক্ষক শিশুমনকে তার স্বাভাবিক আগ্রহ, সামর্থ্য ও চাহিদা অনুযায়ী গড়ে। উঠতে সাহায্য করবেন। মন্তেসরি বলেন—শিশুর জীবনের স্বাভাবিক বিস্তারের কাজে সক্রিয় সাহায্যদান করেন শিক্ষক।
Comments
Post a Comment
Ask me anything here...